মৎস্যজীবীদের সুরক্ষায় ‘জেমিনি’

মৎস্যজীবীদের সুরক্ষায় ‘জেমিনি’

২০১৯ সালের অক্টোবরে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সেন্টার ফর ওশান ইনফরমেশন সার্ভিসেস (INCOIS) এবং ভারতীয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের (AAI) সহযোগিতায় গভীর সমুদ্রে প্রবেশের জন্য মৎস্যজীবীদের সতর্কতা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দুর্যোগ সম্পর্কিত তথ্য বিস্তৃতকরণ এবং কার্যকর প্রচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি নতুন উপগ্রহ ব্যবস্থা চালু করা হয়। বিশেষভাবে ডিজাইন করা একটি ডিভাইস এবং একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন সমন্বিত এই নতুন ব্যবস্থাটি মাছ ধরা এবং অন্যান্য সম্পর্কিত কাজের সুবিধার্থে একাধিক দিনের জন্য সমুদ্রে থাকা মৎস্যজীবীদের সতর্কতা এবং অন্যান্য বার্তা প্রেরণের সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মৎস্যজীবীরা সম্ভাব্য মৎস্যশিকার অঞ্চল (PFZ), সমুদ্রের অবস্থা, উচ্চ সমুদ্র তরঙ্গ, সুনামি এবং ঝড় প্রভৃতি বিষয়গুলিতে পরামর্শ, পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কতা পাচ্ছেন। মোবাইল ফোন ফ্রিকোয়েন্সি দ্বারা এধরনের বার্তাগুলি উপকূল থেকে ১০-১২ কিমি দূরত্ব পর্যন্ত প্রেরণ করা যায়। তবে জেমিনি ব্যবস্থার মাধ্যমে তা ৩০০ নটিক্যাল মাইল (১ নটিক্যাল মাইল = ১.৮৫২ কিমি) পর্যন্ত প্রেরণ করা যাবে।

নতুন এই ব্যবস্থাটিকে ‘জেমিনি’ (GEMINI) বা ‘গগন’ (GAGAN) নামে আখ্যায়িত করা হয়। জেমিনি (GEMINI) শব্দটির পূর্ণরূপ হল গগন এনাবেলড্ মেরিনার’স্ ইনস্ট্রুমেন্ট ফর নেভিগেশন অ্যান্ড ইনফরমেশন (GAGAN Enabled Mariner’s Instrument for Navigation and Information)। আর গগন (GAGAN) শব্দটির পূর্ণরূপ হল জিপিএস-এইডেড জিও আগমেন্টেড নেভিগেশন (GPS-Aided GEO Augmented Navigation)। এই ব্যবস্থাটি ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন (ISRO) এবং এয়ারপোর্টস্ অথোরিটি অফ ইন্ডিয়া (AAI) দ্বারা নির্মিত হয়েছে এবং ‘গগন’ উপগ্রহ ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। গগন উপগ্রহ ব্যবস্থায় জিস্যাট-৮, জিস্যাট-১০ এবং জিস্যাট-১৫ নামে তিনটি জিওসিনক্রোনাস উপগ্রহ রয়েছে এবং এই তিনটি উপগ্রহ পুরো ভারত মহাসাগরকে নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করে।

এই নতুন ব্যবস্থাতে সমস্ত ধরনের প্রধান সতর্কতা এবং বার্তাগুলি গগন (GAGAN) -এর মাধ্যমে প্রেরণ করা হয় এবং ওই বিশেষ ডিভাইসটি তা গ্রহণ করে ব্লুটুথ যোগাযোগের সাহায্যে একটি মোবাইল ফোনে ওই সতর্কতা ও বার্তাগুলি পাঠিয়ে থাকে। এরপর মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনটি তা পাঠোদ্ধার (Decode) করে ব্যবহারকারীর কাছে সমস্ত তথ্যগুলি প্রদর্শন করে। এই ব্যবস্থায় নয়টি ভাষায় সতর্কতা ও বার্তাগুলি পাঠোদ্ধার (Decode) করা যায়। বেঙ্গালুরু-ভিত্তিক সংস্থা অ্যাকর্ড (Acord)-কে এই নতুন ডিভাইসের জন্য প্রযুক্তি দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, জেমিনি (GEMINI) ব্যবস্থাটি চালু করেছিলেন ভারত সরকারের তৎকালীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং ভূ-বিজ্ঞান মন্ত্রী ডাঃ হর্ষ বর্ধন। সংখ্যাসূচক মডেলের আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে পূর্বাভাসগুলি প্রস্তুত করা হয় এবং আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও পরামর্শগুলি সরবরাহ করতে সহায়তা করবে।

২০১৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে সাইক্লোন অক্ষি (Cyclone Ockhi) -এর সময় কমিউনিকেশন ব্ল্যাকআউটের কারণে ২০ জন মৎস্যজীবী নিখোঁজ হয়ে যান। সাইক্লোন অক্ষি চলাকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থায় ফাঁক অনুভূত হওয়ার পরই এই নতুন উপগ্রহ ভিত্তিক পরামর্শ পরিষেবা ব্যবস্থা বিকাশের কাজ শুরু হয়। পূর্বেকার সময়ে, সাইক্লোন উৎপত্তি হওয়ার আগে যেসব মৎস্যজীবীরা মাছ ধরতে গভীর সমুদ্রে চলে যেতেন, তাদের ঘূর্ণিঝড়ের খবর দেওয়া সম্ভব হত না, ফলে মৎস্যজীবীদের প্রাণহানি ও সম্পদহানি হত। ফলে যোগাযোগের অন্ধতা এড়াতে বেশ কয়েকটি সরকারি বিভাগ, গবেষণা সংস্থা এবং বেসরকারী সংস্থাগুলি নড়েচড়ে বসে এবং তৈরি হয় জেমিনি ব্যবস্থা। এটি ইসরোর উপগ্রহের সাথে সংযুক্ত একটি বহনযোগ্য গ্রাহকযন্ত্র (Portable Receiver) এবং অব্যর্থ (Fail-Proof)।
জেমিনি যখন ওই অ্যাপ্লিকেশনটিতে সংযুক্ত থাকে, তখন এটি মৎস্যজীবীদের সমুদ্রের আশেপাশের এলাকায় মাছ ধরার সম্ভাবনাও জানিয়ে দেয়। INCOIS এর অধিকর্তা এবিষয়ে জানান, “এখন আমরা ঝড়ের সতর্কতা এবং সম্ভাব্য মৎস্য আহরণের পরামর্শের মতো পরিষেবাগুলি প্রদান করি, তবে এটি মোবাইল ফোন সংস্থার পরিষেবা ওপর নির্ভরশীল”। এই ডিভাইসের সাহায্যে মৎস্যজীবীরা মোবাইল ফোন সংস্থাগুলির সিগন্যাল সীমার বাইরে সতর্কতা পেতে পারেন। ডিভাইসটিতে শুধুমাত্র একমুখী যোগাযোগের ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ, মৎস্যজীবীরা এটি ফোন করার জন্য ব্যবহার করতে পারবেন না। একটি ডিভাইসের দাম ৯০০০ টাকা, যা সাধারণ মৎস্যজীবীর জন্য তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল। তবে এই ডিভাইসটি মৎস্যজীবীদের ৯০% ভর্তুকি সহযোগে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ভারতের ৯ লক্ষেরও অধিক মৎস্যজীবীদের হাতে এই ডিভাইসটি সহজেই পৌঁছাতে পারে, যদি চিপযুক্ত মোবাইল ফোনগুলি গগন (GAGAN) ব্যবস্থা থেকে সিগন্যাল গ্রহণে সক্ষম হয়। উপগ্রহ ভিত্তিক এইপ্রকার যোগাযোগই জরুরি তথ্য প্রচারের একমাত্র উপযুক্ত সমাধান এবং সাশ্রয়ী মূল্যের উপগ্রহ ভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ঘূর্ণিঝড়, উচ্চ সমুদ্র তরঙ্গ এবং সুনামির মোকাবিলায় প্রচার শৃঙ্খলার অংশ করা উচিত। ভারত ক্রমশই উপগ্রহ ভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থাতে উন্নতি লাভ করছে। আশা করা যায়, আগামী দিনে এধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মৎস্যজীবীদের রক্ষা করতে আরো কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করবে।

লেখিকাঃ- রিত্তিকা দত্ত (বেহালা, পর্ণশ্রী, কলকাতা)
তথ্যসূত্রঃ- The Hindu ; The Indian Express ; Scroll ; Journals of India ; Press Information Bureau/Government of India ; Down To Earth
আপনিও চাইলে আপনার লেখা আমাদের পাঠাতে পারেন ইমেইল এর মাধ্যমে : [email protected]

Leave a Comment

Your email address will not be published.

error: Alert: Content is protected !!